বয়সের সাথে সাথে মস্তিষ্কের ক্ষয়, কমানোর উপায়

মস্তিষ্কের ক্ষয়

ডা. সাঈদ এনাম

প্রায় ৩ পাউন্ড ওজনের এই মানব মস্তিষ্ক, যা মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর এক রহস্যময় কীর্তি। এতে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরন সংযুক্ত রয়েছে এবং এগুলো লাখ লাখ কোটি কোটি ট্রিলিয়ন সংযোগের মাধ্যমে পরস্পরের সাথে সম্পর্কিত।

প্রতিটি জিনিসেরই ক্ষয় রয়েছে, আর এটি মানুষের মস্তিষ্কের ক্ষেত্রেও সত্য। সময়ের সাথে সাথে, মস্তিষ্কের নিউরাল কানেকশন ও সংখ্যায় কমে যায়। ফলে ব্রেইনের কার্যকারিতায় হ্রাস পেতে থাকে।

মস্তিষ্কের ক্ষয় কখন, কীভাবে প্রকাশ পায়

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের মস্তিষ্কের নিউরনের সংখ্যা এবং তাদের সংযোগ এতই হ্রাস পেতে থাকে যে, আমাদের মস্তিষ্কের আকার ও ওজনও অনেকটা কমে আসে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৪০ বছর পর থেকে প্রতি দশকে মস্তিষ্কের ওজন প্রায় ৫% কমে যায়, এবং ৬০ বছর পার হলে এই হার আরও বৃদ্ধি পায়।

সাধারণত বয়স পঞ্চাশের পর মস্তিষ্কে স্বাভাবিক ক্ষয় শুরু হয় এবং তা মৃত্যু পর্যন্ত চলমান থাকে। ব্রেইনের এ ক্ষয় আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ভুলে যাওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া, মেজাজ পরিবর্তন বা আচার-আচরণের পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রকাশ পায়।

মস্তিষ্কের এই ক্ষয় বিশেষভাবে ব্রেইনের হিপোক্যাম্পাস অংশে বেশি ঘটে, যেখানে নিউরনের ক্ষয়ের হার প্রতি বছর প্রায় ১ শতাংশ। ব্রেইনের হিপোক্যাম্পাস অংশ স্মৃতিশক্তি ও কোন কিছু শেখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে কোন কিছু মনে রাখা বা মনে করার দক্ষতা কমে যায়।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে ব্রেইনের রক্তনালীগুলোর স্থিতিশীলতা কমে শক্ত ও সংকুচিত হয়ে যায়, ফলে মস্তিষ্কে রক্ত প্রবাহ কমে যায়। উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল এবং রক্তনালীর গায়ে চর্বি জমলে এই সমস্যা আরও তীব্র ভাবে দেখা দেয়।

মস্তিষ্কের ক্ষয় কীভাবে কমানো যায়

যদি বয়সের সাথে স্মৃতিলোপ পাওয়া, বিভ্রান্তি বা আচরণগত পরিবর্তন দেখা দেয়, তবে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। আলঝাইমার বা অন্যান্য নিউরোডিজেনারেটিভ রোগের লক্ষণ শুরুতেই ধরা পড়লে, ওষুধ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে নিউরনের ক্ষয় ধীর করা সম্ভব।

মস্তিষ্কের এই প্রাকৃতিক পরিবর্তনকে ধীর করার উপায় রয়েছে। কিছু ভালো অভ্যাস, যেমন- বই পড়া, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, সামাজিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকা, মানসিক ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ, শারীরিক সচলতা বজায় রাখা, নিয়মিত হাঠা, নিয়মিত রিলিজিয়াস এক্টিভিটি পালন, তেলাওয়াত করা, ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গ্রহণ এবং মানসিক চাপ কমানো মস্তিষ্কের ক্ষয়প্রক্রিয়া ধীর করতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করে।

কোরআনের শিক্ষা

শেষ করবো মস্তিষ্কের গঠন নিয়ে পবিত্র কোরআনের একটি রহস্যময় আয়াত দিয়ে। সুরা আন-নাহলে আল্লাহ বলেন, “আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়েদের গর্ভ থেকে বের করেছেন, যখন তোমরা কিছুই জানতে না, এবং তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন শ্রবণ, দৃষ্টি ও হৃদয়—যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।”

নিউরোসায়েন্টিস্টদের গবেষণা অনুযায়ী, একটি শিশুর প্রথমে শ্রবণশক্তি (Hearing) সক্রিয় হয়, এরপর দৃষ্টিশক্তি (Vision) এবং সর্বশেষে বোধশক্তি (Cognition, Memory, Emotion) বিকশিত হয়। পবিত্র কোরআনে মানুষের মস্তিষ্কের এই ধারাবাহিক বিকাশ আল্লাহর সৃষ্টির অপূর্ব নিদর্শন।

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ব্রেইন, স্নায়ু ও মনোরোগ বিভাগ, সিলেট মেডিকেল কলেজ